মহাজীবনের আরেক অধ্যায় ।। সৈয়দ শিশির

বই সাহিত্য

উন্মোচিত হয়েছে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেলজীবনের কথা। কারণ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র পর গত মার্চে আমরা হাতে পেয়েছি তাঁর আরেকটি মহামূল্যবান গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’। অত্যন্ত ঘটনাবহুল সময়ের স্মৃতি, যখন যেটুকু সম্ভব, নিজের ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন তিনি। অমূল্য এই সম্পদ রক্ষায় রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে। গ্রন্থটির নামকরণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা।

গ্রন্থটিতে শুধু জেলের ভেতরের জীবন নয়, ষাটের দশকের উত্তাল সময় আর ঘটনাবহুল রাজনীতির চিত্র তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধু। এক্ষেত্রে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, জেলখানায় বসে লেখার কাজটি খুব সহজ ছিল না। একদমই নির্বিঘ্ন ছিল না। এতকিছুর পরও বঙ্গবন্ধুর কারাগারের স্মৃতি হয়ে ওঠেছে কালের সাক্ষী। ইতিহাসের অমূল্য স্মারক।

১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা উত্থাপনের পর ওই বছরের প্রথম তিন মাসে আটবার গ্রেপ্তার ও জামিন পান বঙ্গবন্ধু। এরপর মে মাসে আবার গ্রেপ্তার হন। গ্রন্থটিতে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঘটনাবহুল জেলজীবনচিত্র ওঠে এসেছে। এটি ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সালের দিনলিপি হলেও বঙ্গবন্ধু কখনো ফিরে গেছেন ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে, কখনো বা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা সেই মহৎ সংগ্রামে। বর্ণনা করেছেন সেই সময়কার সংগ্রামে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের ভূমিকার কথা। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, দিনলিপিতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের দান সবচেয়ে বেশি। …আওয়ামী লীগ যখন ১৯৫৬ সালে ক্ষমতায় বসল তখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করল।” (পৃষ্ঠা: ২০৬-২০৭)

প্রসঙ্গত, ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ডায়েরি দুটি যথারীতি জব্দ করেছিল বলে জানা গেছে। তারপর ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে এবং পুলিশের বিশেষ শাখার সহায়তায় উদ্ধারকৃত একটি ডায়েরিই ‘কারাগারের রোজনামচা’ শিরোনামে প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। গ্রন্থ প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন পা-ুলিপি সংরক্ষণ করছিলেন। তিনি একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকাও লিখেছেন। কৌতূহলী পাঠকের জন্য ভূমিকায় রয়েছে বইয়ের শুরু ও শেষের খুঁটিনাটি বিভিন্ন তথ্য জানার সুযোগ।

গ্রন্থটিতে আছে ছয় দফার কথা। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু জেলে বসেও রাজনীতি নিয়ে ভাবছিলেন। সক্রিয় ছিলেন। ওই বছরের ৬ জুন ডায়েরির পাতায় তিনি লিখেছেন, ‘আগামীকাল ধর্মঘট। পূর্ব বাংলার জনগণকে আমি জানি, হরতাল তারা করবে। রাজবন্দিদের মুক্তি তারা চাইবে। ছয়দফা সমর্থন করবে।’ নানা প্রসঙ্গে সে সময়ের বহু রাজবন্দির কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।

অনেকে জেনে অবাক হবেন, বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে জেলে রান্নাও করেছেন। আরও লিখেছেন, একদিন জেলখানার একজন সিপাহী বঙ্গবন্ধুর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্যার আপনাকে নাকি আপনার বাবা ত্যাজ্যপুত্র করে দিয়েছে, রাজনীতি করার জন্য আর বারবার জেল খাটার জন্য?’ বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছেন, ‘এরকম কথা আমি জীবনে অনেক শুনেছি, আমার বাবা আজও আমাকে যে স্নেহ করেন, তা বোধহয় অনেক পুত্রের কপালেই জোটে না জীবনে।’

গ্রন্থটি পাঠে পাঠক বঙ্গবন্ধুর মার্জিত রসবোধের সঙ্গেও পরিচিত হবেন। সুযোগ পেলেই তিনি ব্যঙ্গ, বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য করেছেন। প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের বাজেটের একটা বড় অংশ মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ইন্দোনেশিয়াকে ১৪ কোটি টাকা ঋণদানের ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু ব্যঙ্গ করে লিখেছেন: ‘দয়ার মন আমাদের! এমন প্রেম-ভালোবাসাই তো আমাদের নীতি হওয়া উচিত! কাপড় যদি কারও না থাকে তাকে কাপড়খানা খুলে দিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে আসবা। আমাদের সরকারের অবস্থাও তাই।’

গ্রন্থটির প্রতিটি দিনলিপির শেষে বঙ্গবন্ধুর একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতার নিদারুণ কষ্ট প্রকাশ পেয়েছে। কেননা, দিন শেষে সন্ধ্যা নামলেই তাঁর কক্ষে তালা লেগে যেত! সহৃদয় পাঠকও যেন তাঁর জীবনের এই অংশে এসে অশ্রুসজল হয়ে পড়ে।

সৈয়দ শিশির : কবি ও সাংবাদিক