আফগানিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি

তালেবানি শাসন: কোন পথে আফগানিস্তান?

মতামত

মনোজ কান্তি দাশ

বৈশ্বিক রাজনীতিতে আফগান একটি অমীমাংসিত ইস্যু। আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান নতুন নয়। এর আগে তারা তৎকালীন সোভিয়েত সমর্থিত আফগান মুজাহিদদের হটিয়ে ৯০ দশকে ক্ষমতা দখল করেছিল। বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য তখন পুঁজিবাদের প্রতিভূ আমেরিকার সিআইএ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দ্বারা তালেবানদের তৈরি করে। তালেবানদের অস্ত্র গোলাবারুদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আ সে পপি থেকে উৎপাদিত হেরোইন বিক্রি করে। বিশ্বব্যাপী হেরোইনের একটা বড় অংশ আসে আফগানিস্তান থেকে।

তালেবানরা ক্ষমতায় এসে বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতি হুমকি হয়ে উঠলে এবং আল কায়দা নেতা অসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিলে আমেরিকার সাথে তালেবানদের সম্পর্কের অবনতি হয়। আল কায়দা আমেরিকার টুইন টাওয়ারে আক্রমণ করলে আমেরিকার জন্য আফগানিস্তান আক্রমণ ফরজ হয়ে পড়ে। আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী আফগান দখল নিয়ে তাবেদার সরকার গঠন করলে দুর্গম ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে তালেবানরা আত্নগোপন করে পাকিস্তানের সহায়তায় নিজেদের শক্তি অটুট রাখে। এ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি হয়। ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কারণে আমেরিকা তালেবানদের কখনোই নির্মূল করতে পারেনি, পারবেও না। আমেরিকা এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাছাড়া আমেরিকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নতুন সরকারের কাছে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অর্থহীন মনে হলে তারা সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় এবং প্রত্যাহার শুরু করলে সমস্ত দৃশ্যপট বদলে যায়। তাবেদার সরকার পালিয়ে যায় এবং একপ্রকার বিনা বাধায় তালেবানরা ক্ষমতা দখল করে।

এই প্রক্রিয়ায় তালেবানরা সরকার গঠনের জন্য বহির্বিশ্বের স্বীকৃতি আদায় করতে সচেষ্ট হলে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান সহজ বেশকিছু দেশ কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে। চীন রাশিয়া জানিয়ে দেয় তালেবানরা আল কায়দার সঙ্গে সম্পর্কে না জড়ালে তারা তাদের সমর্থন দিবে। ইতোমধ্যে তালেবান নেতৃত্বের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায় তালেবানরা অচিরেই পূর্নাঙ্গ সরকার গঠন করবে। এখন দেখার বিষয় তালেবানরা কি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জঙ্গিবাদ থেকে সরে এসে একটি মডারেট মুসলিম দেশ হবে নাকি পুরনো পথে হাঁটবে।

ইতোমধ্যে তারা দেশটির নাম করেছে ইসলামিক এমিরেটস অব আফগানিস্তান। তাছাড়া দেশের পুনর্গঠন এবং জনগণের আস্হা অর্জন তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেন্জ। তারা নিজেদের ভাবমূর্তি উত্তরণে সচেষ্ট হলে অনেককেই পাশে পাবে। এবং এই অন্চলে যে টেনশন বিরাজ করছে, তা লাগব হবে। তবে একটা আশংকা থেকেই যায়। তালেবানরা রাষ্ট্র পরিচালনায় খুবই অনভিজ্ঞ। আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে তাদের নুন্যতম পরিচয় নেই। এবিষয়টা তারা কিভাবে মোকাবিলা করবে, সেটা একটা উদ্বেগের বিষয়। কারণ দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামোর কারণে অভ্যন্তরিন গোষ্ঠী সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে যা প্রকারান্তরে আফগানিস্তান একটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। এর প্রভাবে গোটা দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠন গুলো পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবাধিকার পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে আফগানিস্তানলর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ শংকা প্রকাশ করেছে। বর্তমানে খুবই নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্হানীয় জনগণের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। তারা আফগানিস্তানে থাকতে চাচ্ছে না। ফলে শরনার্থী সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটা মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করবে। সবশেষ যে বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর, তাহলো নারীর অধিকার। কাবুলের নারীরা সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। তালেবানরা ইতোমধ্যে নারী শিক্ষা ও অধিকার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে। নারী শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করে না। তালেবানি শাসনে নারীরা সবচেয়ে বেশি ভালনারেবল। এটা বিশ্ববাসীর জন্য উৎকন্ঠার কারণ হতে পারে। তালেবান শাসনে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তা স্পষ্ট হতে চলেছে। আসলে তালেবানি শাসন তার অভ্যন্তরীন ত্রুটি বিচ্যুতি এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা করে কিভাবে একটা রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং তাদের বৈদেশিক নীতি কি, এগুলোই এখন দেখার বিষয়। এজন্য বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। কথায় বলে Morning shows the day.

মনোজ কান্তি দাশ : কলাম লেখক