মাস্ক ব্যবহার

ক্রান্তিকালে ঈদ উৎসব ।। ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

মতামত

মতামত

বিশ্বব্যাপী করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের শোচনীয় পরিস্থিতি, সংক্রমণ বিস্তার ও প্রাণসংহারের পরিসংখ্যান ভয়ংকররূপে প্রতিফলিত হচ্ছে।

বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ক্ষুদ্র অণুজীব আক্রমণের ভয়াবহতা ও করুণ আর্তনাদ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে শুধু ক্ষতবিক্ষত করছে না, ভ্যাকসিন উৎপাদন-সংগ্রহ এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সংকটে মৃত্যুর নির্দয় মিছিলকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বিশ্বের এক ডজনেরও বেশি দেশে পাওয়া গেছে। এ ভ্যারিয়েন্ট অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি ছোঁয়াচে যে টিকা নিয়েও একে কাবু করা দুরূহ হয়ে পড়ে।

২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত ইউনাইটেড নেশনস ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স (ইউএনডিইএসএ) রিপোর্ট সূত্রে অবহিত হয়েছি, করোনার কারণে ২০২০ সালে অর্থনীতির সংকোচন হয়েছে প্রায় ৪.৩ শতাংশ, যা ২০২১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হতে পারে ৪.৭ শতাংশ। রিপোর্টে ব্যক্ত হয়েছে, সামাজিক ও জলবায়ুগত স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে কার্যকর চেষ্টা শুরু না হলে দীর্ঘদিন ধরে মন্দার প্রভাব চলতে থাকবে। এ প্রেক্ষাপটে দেশীয় ও বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা, কর্মহীনতা ও দারিদ্র্যের আশঙ্কাজনক ঊর্ধ্বগতি, সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পবিত্র রমজান এবং বাঙালির সর্বজনীন ঈদ উৎসবকে ঘিরে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস গত বছরের মতো এ বছরও ধূসর পাণ্ডুলিপি তৈরি করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা সামাজিক খাতকে সমৃদ্ধ করলেও দরিদ্র-হতদরিদ্রের মাঝে অনুপ্রেরণার এ রসদ প্রয়োজন মেটাতে কতটুকু পর্যাপ্ত, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, করোনা মহামারির এক বছরে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৫১ জন। বিগত বছর শেষে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯০টি।

পক্ষান্তরে দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে। এ অবস্থায় দেশের বিত্ত-সম্পদশালী ব্যক্তিদের উদারহস্ত সম্প্রসারিত না হলে ঈদ উদ্যাপন এক নিরানন্দ পরিবেশেরই উন্মোচন ঘটাবে, যা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

এ অবস্থায় জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘ঈদ মোবারক’ কবিতার পঙ্ক্তি এবং তার নির্যাস হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত করতে হবে : ‘ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,/সুখ-দুখ সম-ভাগ করে নেব সকলে ভাই,/নাই অধিকার সঞ্চয়ের!/ কারো আঁখি-জলে কারো ঝাড়ে কি রে জ্বলিবে দীপ?/দু’জনার হবে বুলন্দ্-নসিব, লাখে লাখে হবে বদ্-নসিব?/এ নহে বিধান ইসলামের।/ ঈদ-উল-ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান/ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান,/ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার!/ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,/তৃষাতুরের হিসসা আছে ও-পিয়ালাতে,/দিয়া ভোগ কর, বীর, দেদার।’

রোজা ইসলাম ধর্মের তৃতীয় রোকন। শান্তির বার্তা নিয়ে যে ইসলামের আবির্ভাব, তার অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনে আত্মশুদ্ধির পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। কঠিন পরিচর্যার মাধ্যমে এক মাস রোজা পালনের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে মহা আনন্দ উৎসব উপহার দেওয়া হয়েছে, তা হচ্ছে ঈদুলফিতর। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে পুরো বিশ্ব প্রাণঘাতী করোনা অতিমারিতে পর্যুদস্ত। এ দুঃসময়ে ঈদের আনন্দ যাতে করোনা সংক্রমণ বিস্তারের মাধ্যমে নিরানন্দে পরিণত হতে না পারে, সেজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সামাজিক দূরত্ব ও সংক্রমণ প্রতিরোধে নানাবিধ নির্দেশনা-বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

যদিও সর্বজনীন এ উৎসব আবহমানকাল থেকে শুধু ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের নয়, ধর্মদলমত-নির্বিশেষে পারস্পরিক কুশল বিনিময় ও বন্ধুত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে সৌহার্দ, সম্প্রীতি এবং সব মানবের জন্য মঙ্গল কামনায় নিবেদিত।

মহান আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস অর্থাৎ ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত-এ পাঁচটি হলো পবিত্র ইসলামের মূল ভিত্তি। এর মধ্যে নামাজ-রোজা-জাকাতকে ঘিরে যে মাসটি সবচেয়ে সমাদৃত, সে মাসকেই পরিপূর্ণভাবে মর্যাদাসীন করার লক্ষ্যেই এর শেষে পবিত্র ঈদ বা সর্বোচ্চ উৎসবের দিন ধার্য করা হয়।

রমজান মাসের তাৎপর্য ইসলামের ইতিহাসে বিশাল। এ মাসেই প্রিয় নবীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় মহান বদরযুদ্ধ। মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি নিয়ে প্রায় এক হাজার শত্রু মোকাবিলা করে মহাল আল্লাহর অপার কৃপায় ইমানি শক্তিবলে জয়লাভ করে মুসলমানরা। এ যুদ্ধে জয়ী হতে না পারলে পবিত্র ইসলাম ধর্ম সুদৃঢ় হয়ে আজকের পর্যায়ে আসতে পারত কি না সন্দেহ। এ পবিত্র রমজানেই পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃত মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। এ রকম বহু ঘটনা আছে, যা এ মাসকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।

পবিত্র রমজান মাসের শেষে যে ঈদুলফিতর বা ঈদ উৎসব, তার সমৃদ্ধ পরিপ্রেক্ষিত উপলব্ধি করতে হলে পবিত্র রমজানের দর্শন তথা সংযম, ত্যাগ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ, আচার-আচরণ, নামাজ-দোয়া, অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়া, গরিব-দুঃখীদের উদ্দেশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদির আলোকে তা অনুধাবন করতে হবে।

ইফতার-সেহরি, তারাবির নামাজ আদায়, জাকাত প্রদান ইত্যাদির পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে এক আল্লাহতালার সৃষ্ট মানব হিসাবে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, অন্যের ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা ইত্যাদি পরিহার করে পরিপূর্ণ মানবিকতা-অসাম্প্রদায়িকতায় দীক্ষিত হয়ে মননশীল ও সুন্দর মানসিকতায় ঋদ্ধ হওয়া পবিত্র রমজানের শিক্ষা। সবাই মিলেমিশে শ্রেণি-বর্ণ-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ঈদ উৎসব পালন ও আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও শান্তি নিহিত। উল্লেখ্য, এ মাসে জাকাত ও ফিতরা দেওয়ার রেওয়াজ একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যের অসাধারণ উদাহরণ। জাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি বা পবিত্র করা।

ব্যক্তিগত গচ্ছিত সম্পদের ওপর গরিবের যে পাওনা রয়েছে, তা আদায় করার নামই জাকাত। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে, ‘তোমরা মানুষকে আল্লাহর হুকুম মতে সম্পদের যে অংশ অন্যদের বণ্টন করে দাও তা তোমাদের সম্পদের বৃদ্ধি ঘটায়।’ অর্থাৎ জাকাত-ফিতরা আদায় করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বা সমাজের গরিব-দুঃখী মানুষকে খাদ্যদ্রব্য, নতুন কাপড়-চোপড় বা নগদ অর্থ প্রদান করে তাদের অভাব ঘোচানো বা স্বাবলম্বী হওয়ার পথে উৎসাহিত করাই এর লক্ষ্য।

জাকাতদাতা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ উপাজর্নের পথে নিয়োজিত থাকবেন এবং এ বৈধ উপার্জন থেকেই অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন, এটিই কাম্য। অপরদিকে জাকাতগ্রহীতা দাতার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখে প্রাপ্ত জাকাত যথাযথভাবে ব্যবহার করে নিজে স্বাবলম্বী হয়ে অন্যকে জাকাত প্রদান করে উৎসাহিত করার মনমানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হবেন, এটিই প্রত্যাশিত।

ঈদ উৎসবের মহাশিক্ষা হচ্ছে মনের সব কালিমা ও পাপের গ্লানিকে দূর করে, লোভ-লালসাকে সংহার করে, অন্ধকার-অসূচি-বিদ্বেষ-বিভেদ-কূপমণ্ডূকতা, সাম্প্রদায়িকতাসহ সব অশুভ-অসুন্দর মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে একটি সমৃদ্ধ, সুন্দর ও উজ্জ্বল মনের পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং দেশ-জাতিকে ভালোবেসে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা। বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ করোনা বাস্তবতা নতুন করে স্রষ্টার অমূল্য সৃষ্টি মানবজাতিকে মানবিকতার ধারণায় উজ্জীবিত হতে পরিচিন্তিত করেছে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়