ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

ঈদে মিলাদুন্নবীর শিক্ষা ও মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শ

টপ স্টোরি ধর্ম সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

বছর ঘুরে বিশ্ব জগতে আবার এসেছে রবিউল আউয়াল। ৩০ অক্টোবর (১২ রবিউল আউয়াল) শুক্রবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম এবং ওফাত দিবস। দিনটি সমগ্র বিশ্বে মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

ঈদ, মিলাদ আর নবী- এই তিনটি শব্দ যোগে দিবসটির নামকরণ হয়েছে। ঈদ অর্থ- আনন্দোৎসব, মিলাদ অর্থ- জন্মদিন আর নবী অর্থ- নবী বা ঐশী বার্তাবাহক। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ২৯ আগস্ট, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার, সুবহে সাদিকের সময় মহাকালের এক মহাক্রান্তিলগ্নে মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। আবার ৬৩ বছরের এক মহান আদর্শিক জীবন অতিবাহিত করে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ৮ জুন, ১১ হিজরি রবিউল আউওয়াল মাসের ১২ তারিখ তিনি পরলোক গমন করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) গোটা মানবজাতির জন্য এমনকি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত ও আশীর্বাদ হিসেবে ধরাধামে আবির্ভূত হন। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (আম্বিয়া, আয়াত- ১০৭) আল্লাহতায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুল! আমি আপনাকে বিশ্বের সমগ্র মানুষের সংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ (সাবা, আয়াত- ২৮)

মহানবীর (সা.) আবির্ভাবের পূর্বের সময়কে জাহেলিয়াত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলা হতো। তাঁর শুভাগমনের ফলে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয় আরব দেশ থেকে। অতুলনীয় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করে এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে তিনি অসভ্য ও বর্বর আরব জাতিকে পরিণত করেন সুসভ্য জাতিতে। তাঁর নির্দেশিত পথে বৈষম্য দূরীভূত হয়। ধনী, গরিব, সাদা-কালো, চাকর-মুনিবের পার্থক্য মুছে যায়। বিচারালয়ে কায়েম হয় সুবিচার। অরাজকতাপূর্ণ রাষ্ট্র পরিণত হয় কল্যাণকর রাষ্ট্রে। ফলে ইসলামের সৌরভ ও জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে।

মহানবী (সা.) বিশ্বকে সভ্যতা ও সংস্কৃতির শিক্ষা দিয়েছেন। অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতিসহ মানবজীবন পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে যে নীতিমালা তিনি দিয়েছেন তা সর্বকালের মানুষের জন্য অনন্য ভাস্বর ও সবচে বেশি কার্যকর। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে নবী মোস্তফা (সা.) উপস্থাপিত ইসলামী বিধানের যতো মিল রয়েছে তা অন্য কোনো মতাদর্শের সঙ্গে নেই। যে কারণে মুসলমানগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রায় ৮ শ’ বছর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, দিয়েছিল নেতৃত্ব। পরবর্তীকালে মুসলিম শাসকদের বিলাসিতা, লোভ-লালসা, অদূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়তে থাকে মুসলমানরা। যতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা মহানবীর (সা.) আদর্শকে পরিপূর্ণরূপে ধারন ও লালন না করবে ততদিন পর্যন্ত মুসলিম জাতির দুঃখ-দুর্দশা ঘুচবে না।

প্রতি বছর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের মাধ্যমে মুসলিম জাতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও জীবনাচরণকে নিজেদের কর্মজীবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং নিজেদেরকে সুন্দর করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। এমনিভাবে নবচেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মাধ্যমে ঈমানের বলিষ্ঠতা আমলের পরিপূর্ণতা অর্জন সার্বিক সৌভাগ্য ও কল্যাণ লাভের পথ সুগম করে। কারণ মহানবীর (সা.) শিক্ষা ও তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ মানবজীবনের উৎকর্ষ সাধন ও সাফল্য লাভের চাবিকাঠি।

আরও পড়ুন >> স্বাস্থ্যবিধি : মাস্ক ব্যবহারে শৈথিল্য কাম্য নয়

মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা নিজের হৃদয়ে সুদৃঢ় করা, তার রেখে যাওয়া বিধি-বিধান ও সু্নাতকে আঁকড়ে ধরার মতো ঈমানী শক্তি সঞ্চয় করা, যাবতীয় কর্মকাণ্ডে তার নীতি, আদর্শ ও শিক্ষা বাস্তবায়ন করা মুসলমানদের কর্তব্য। কেননা, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুগত্য ও অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্তমান সমস্যাসংকুল বিশ্বে রাসুলুল্লাহর (সা.) অনুপম আদর্শ ও সার্বজনীন শিক্ষা অনুসরণই বহু প্রত্যাশিত শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের সবার মনে সহনশীলতা, সংযম, হৃদ্যতা, সম্প্রীতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সৃষ্টিতে সহায়ক হোক।