আইসিইউ

ঈদের গল্প: বেড নম্বর ১৫

সাহিত্য

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী »

‘আইসিইউতে কোনো বেড খালি নাই।’

‘দুঃখিত। একটা সিট ফাঁকা ছিল। মাত্রই নতুন রোগী আসল।’

‘এক সপ্তাহ ধরে কোনো বেড খালি নেই। অন্য কোথাও চেষ্টা করেন।’

করোনায় আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে যে হাসপাতালে যাচ্ছে রাব্বানী সেখানেই তাকে এমন কথা শুনতে হচ্ছে। তবুও সে হাল ছাড়তে রাজি না। রাব্বানীর বিশ্বাস কোথাও না কোথাও সিট মিলবে। অনেক আশা নিয়ে রাব্বানী অ্যাম্বুলেন্সে বাবাকে নিয়ে ছুটছে সোহ্রাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের দিকে।

মাত্র দুদিন আগেই করোনায় আক্রান্ত মাকে নিয়ে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল রাব্বানীকে। পরে পরিচিত এক চিকিৎসক তার মাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। বর্তমানে তার মা হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে ১৫ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আছেন। রাব্বানীর একমাত্র ছোট বোন নিপা আছেন মায়ের সঙ্গে।

এদিকে সকাল থেকে গোটা ঢাকা শহর ঘুরতে ঘুরতে অ্যাম্বুলেন্স চালক হাসেমের মধ্যে ক্লান্তি ভাব চলে এসেছে।

কয়েকদিন ধরে করোনার ঊর্ধ্বগতি। লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুর সংখ্যাও কমছে না। নতুন এ ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত মানুষ স্বল্প সময়েই দুর্বল হয়ে পড়ছেন। ফুসফুসের সংক্রমের কারণে অনেকের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে তীব্র আকারে। রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতাল করোনা রোগীতে কানায় কানায় পূর্ণ। রোগীর সংখ্যা সামাল দিতে হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আইসিইউ বেড এখন সোনার হরিণ। রাব্বানীর মতো অনেকেই সংকটাপন্ন রোগীদের নিয়ে ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। অনেকের মৃত্যু হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সেই। গতকাল হাসেমের অ্যাম্বুলেন্সেও একজন মারা গেছেন।

আজও এমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে কিনা সেই সংশয়ে আছে হাসেম। মানুষের আহাজারি আর মৃত্যু দেখতে দেখেতে সে মানসীকভাবে ভারাক্রান্ত। হাসেম দশ বছর ধরে ঢাকা শহরে অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছে। তার ধারণা গত নয় বছরে যত মানুষ অ্যাম্বুলেন্সে মরেছে তার চেয়ে বেশি মরেছে এ করোনাকালীন সময়ে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের আইসিইউ ইউনিটে কোন সিট খালি নেই। রাব্বানী হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আবার অ্যাম্বুলেন্সে উঠল। এখন কোনদিকে যাবে সে চিন্তায় পড়ে গেল।

এমন সময় হাসেম বললো, কোনদিকে যাব ভাই? ঢাকা শহরের হাসপাতাল তো দেখার আর বাকি রাখেন নাই।

প্রশ্ন শুনে নির্বাক হয়ে গেল রাব্বানী। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো তার বাবা সেলিম আহমেদের দিকে। অ্যাম্বুলেন্সের স্টেচারে শুয়ে আছেন তিনি। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় তার বুকের খাঁচাটা ভেতরে ঢুকছে আর বের হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের হাড়গুলো ধনুকের মতো বাঁকা আর সোজা হচ্ছে। শ্বাসকষ্টের তীব্রতায় মুখে পড়েছে কালচে ছাপ। চোখ দুটো ছোট হয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। মাঝে মধ্যে তিনি কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ খুলে তাকান। তারপর আবার বন্ধ করে ফেলেন।

বাবার এ অবস্থা দেখে রাব্বানী দিশেহারা হয়ে পড়ল। নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত রাখার চেষ্টা করেও পারছে না। তার চোখের পানি নাকের দু’পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। কোনোক্রমেই সে অশ্রু আটকে রাখতে পারছে না। নাক আর চোখের পানিতে তার সার্জিকেল মাস্কও অনেকখানি ভিজে গেছে।

হাসেম আবার বললো, ভাই এখানে বেশি সময় অ্যাম্বুলেন্স দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না। কোনদিকে যাব বলেন।

রাব্বানী বলল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের দিকে চলেন।

ভাইজান সকালে তো সেদিকে গিয়েছিলাম।

তাহলে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে।

সেখান থেকেও তো ঘুরে আসলাম।

মিরপুরের দিকে চলেন।

ভাই সেখান থেকেও তো আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।

তাহলে! তাহলে…

হাসেম বললো, ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলেন। এভাবে আর কত ঘুরবেন?

আমার মাথা কাজ করছে না। আপনি তো অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে নানা হাসপাতালে যান। আমার বাবার জন্য একটা বেড পাব এমন কোনোদিকে নিয়ে যান। বললো, রাব্বানী।

ভাই তাহলে চলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে যাই।

রাব্বানী বললো, সেখানে অনেক কষ্টে একটা সিটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল মায়ের জন্য। নতুন কোনো সিট ফাঁকা হলে বোন ফোন দেবে। তা ছাড়া পরিচিত এক ডাক্তারকেও বলা আছে। চলেন আমরা বরং উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মেত্রী হাসপাতালের দিকে যাই।

চলেন তাহলে। এ কথা বলে অ্যাম্বুলেন্স চালাতে শুরু করল হাসেম।

অ্যাম্বুলেন্স সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল থেকে উত্তরার দিকে সাইরেন বাজিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্সের ছোটাছুটি। রয়েছে লাশবাহী গাড়িও। ইদানীং রাস্তায় যে পরিমাণ অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ি দেখা যাচ্ছে তা আগে কখনো দেখেননি নগরবাসী। চারদিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে গোটা শহরকে যুদ্ধের নগরীর মতো মনে হচ্ছে।

এমন সময় রাব্বানীর মোবাইলে ফোন বেজে উঠল। একবার রিং হতেই সে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করল। তার ছোট বোন নিপা ফোন করেছে। রাব্বানী ভাবল হয়তো কোনো আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা হয়েছে। এমন আশা নিয়ে সে ফোন রিসিভ করল।

কিরে কোন সিট ফাঁকা হয়েছে নাকি?

ওই পাশ থেকে চাপা কান্নার শব্দ ছাড়া কিছু শুনতে পেল না রাব্বানী।

এই নিপা কথা বলছিস না কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি।

নিপা মুখে ওড়না চেপে ধরে কান্না আটকে রেখে বলল, না ভাইয়া। তুমি এখন কোথায়?

বাবাকে নিয়ে উত্তরার দিকে যাচ্ছি। সকাল থেকে গোটা শহর ঘুরেও কোথাও কোনো সিট পেলাম না। তোর এখানে কোনো সিট খালি হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন দিস।

নিপা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ভাইয়া তুমি বাবাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে চলে আসো তাড়াতাড়ি। ১৫ নম্বর বেড খালি হয়েছে।